পেঁয়াজু বিক্রি করেই কোটিপতি মাসুদ

কালিয়াকৈর বাস স্ট্যান্ডে নামলেই হাতের ডানে বাজার রাস্তার মোড়ে ফলপট্টিতে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিদিনই মানুষের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্য করা যায়। প্রথমে কেউ প্রথম দেখলেই মনে করবে এখানে কোন বিষয় নিয়ে জটলা বেঁধেছে। কিন্তু ওরকম কিছু না, কাছে গিয়ে খেয়াল করলেই দেখা যায় একটি দোকানে পেঁয়াজু ও ভাজাপোড়ার নানান সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য এতো মানুষের সমাগম।বলছিলাম- গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বরইতলী গ্রামের মোঃ মাহফুজুর রহমান মাসুদ খানের বাজারের ফুটপাতে গড়ে তোলা দোকানের কথা।মাসুদ খানের দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, সেদ্ধ ছোলাসহ নানা ধরনের ভাজাপোড়া সাজিয়ে রাখা হয়েছে। একের পর এক ক্রেতা পছন্দের খাবার কিনছেন। দোকানের পাশে ১৮-২০ কর্মচারী এসব খাবার তৈরি করছেন। কেউ পেঁয়াজ কাটছেন, কেউ পেঁয়াজু, বেগুনি ও আলুর চপ বানাচ্ছেন। আবার কেউ বড় পাত্রে ভাজাপোড়া খাবার দোকানে সাজিয়ে রাখছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে এসব খাবার তৈরি ও বিক্রি।

জানা যায়, এই পেঁয়াজু অনেক সুস্বাদ হওয়ার কারণে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে পেঁয়াজু খেতে মানুষ ভিড় জমায় তার দোকানে। কালিয়াকৈর ছাড়াও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, ময়মনিসংহ, জামালপুর এমনকি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে কেউ কেউ এসে পেঁয়াজু কিনে নিয়ে যান। সর্বপ্রথম দুই টাকা থেকে পেঁয়াজু বিক্রি শুরু করেন তিনি, বর্তমানে একটি পেঁয়াজুর দাম ১০ টাকা। প্রতিদিন ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পেঁয়াজু বিক্রি হয় ছোট্ট এই দোকানে। শুক্রবার সাপ্তাহিক হাটের দিন হওয়ায় প্রতি শুক্রবারে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বেচা-বিক্রি হয় বলেও জানিয়েছেন দোকানের ম্যানেজার ওমর উদ্দিন।প্রায় ৩০ বছর যাবত তিনি এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এই কর্মযজ্ঞে বর্তমানে কাজ করছেন ২২ থেকে ২৫ জন কর্মচারী। এসব কারিগর-কর্মচারীকে মাসে ছয় লাখ টাকা বেতন দেন। দোকান মালিক শুধু পেঁয়াজু বিক্রি করেই হয়ে গেছেন কোটিপতি।

বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের ৬ বোন ২ ভাই ও মাসহ পরিবারের ৯ জনের ভরণপোষণের দায়িত্ব পড়ে মাসুদ খানের ওপর। পরে এ অবস্থায় ১৯৯২ সালে মাত্র ৩০০ টাকা পুঁজি নিয়ে ফুটপাতে পেঁয়াজুর ব্যবসা শুরু করে তাক লাগিয়ে দেন। এই ব্যবসা করেই তিনি করেছেন অনেক জায়গা-জমি, নির্মাণ করেছেন নিজের জন্য পাকা দালান ও বিয়ে দিয়েছেন তার ৬ বোন।নার্সিং কলেজের ছাত্র শাওন বলেন, ‘প্রথমে কালিয়াকৈরের আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে এই পেঁয়াজুর কথা শুনি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও দেখে আমার আগ্রহ হয়। আমি প্রায় ৩০০ কি.মি. দূরে লালমনিরহাট থেকে এসেছি। পেঁয়াজু খেয়ে আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে এতো দূর থেকে আসা সার্থক হয়েছে। পেঁয়াজুর এতো স্বাদ এর আগে আমি আর কোথাও পাইনি।’নার্সিং কলেজের আরেক ছাত্রী ফারজানা বলেন, ‘আমি ফেসবুকে এই পেঁয়াজুর বিষয়টি দেখে এখানে খেতে এসেছি। আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে এবং মনে হয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত।’

কালিয়াকৈর রেমন্ড টেইলার্সের মালিক খুশি বলেন, ‘আমাদের এই মার্কেটের নিচেই মাসুদ ভাইয়ের পেঁয়াজুর দোকান এখানে অনেক দূর থেকে মানুষ পেঁয়াজু খেতে আসে। এখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচুর ভীড় হয়। আমি নিচে নামলেই মাঝে মাঝে পেঁয়াজু খাই আমার কাছে অনেক মজা লাগে। আমার এক বউদি উত্তরা দিয়াবাড়ী থাকেন তিনি মাঝে মাঝেই এখান থেকে পেঁয়াজু কিনে নিয়ে যায়।’কারিগর আইয়ুব আলী বলেন, ‘১০ বছর ধরে এই দোকানে পেঁয়াজুসহ নানা ভাজাপোড়া তৈরি করছি। আমার মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। তবে রমজান মাসে ৪০ হাজার টাকা পাই। আমাদের পিয়াজু স্বাদ হওয়ার পিছনে কিছু কারণ আছে। আমরা নিজেদের বানানো কিছু মসলা ব্যবহার করি তাই এতো বেশি স্বাদ হয়। সেই বিশেষ মসলার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এগুলো বলা যাবেনা।’আরেক কারিগর দুলাল মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পেঁয়াজুসহ নানা খাবার তৈরি করি। প্রতি মাসে নিয়মিত বেতন পেয়ে যাই। আসলে সারা বছরই আমাদের বেচাকেনা ভালো হয়। এজন্য আমরা সবাই খুশি।’

দোকানের আরেক কারিগর নাহিদ হোসেন বলেন, ‘তিন বছর ধরে চাকরি করছি। ১৮ হাজার টাকা বেতন পাই। পরিবার নিয়ে খুব সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছি।’দোকানের বাবুর্চি বাবুল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমার মাসিক বেতন ১৮ হাজার টাকা। রমজান মাসে ৩০ হাজার টাকা পাই। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেশ ভালো আছি। আমাদের দোকানের পেঁয়াজুর সুনাম সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। একটু কমবেশি প্রতিদিন ভালো রকম বেচাকেনা হয়।’দোকানের ম্যানেজার ওমর উদ্দিন বলেন, ২২ বছর ধরে এই দোকানে চাকরি করছি। এই চাকরি করে তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। তিনতলা বাড়ি করেছি। মাসে এখান হতে ৪৫ হাজার টাকা বেতন পাই, বেতনভাতা সহ কোন কোন মাসে ৫০ হাজার টাকাও পাই। প্রতিদিন ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা বিক্রি হয়। শুক্রবার ১ লক্ষ টাকার উপরেও বিক্রি হয়, রমজান মাসে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার বেশিও বিক্রি হয়। ক্রেতার ভীড়ে মাঝে মাঝে দুপুরে খাবার যেতে পারি না।

দোকানের মালিক মাসুদ খান বলেন, ‘৩০ বছর আগে ফুটপাতে পেঁয়াজু বিক্রি শুরু করি। আমার পেঁয়াজুর বিশেষত্ব হলো পেঁয়াজের সঙ্গে অল্প পরিমাণ ময়দা, কাঁচা মরিচ, ধনিয়া পাতা এবং বিশুদ্ধ সয়াবিন তেল দিই। পুরনো তেল দিয়ে কখনও পেঁয়াজু ভাজি না। আমাদের এখানে ভেজাল কোন প্রকার খাবার দেওয়া হয় না।আমাদের নিজস্ব তৈরীকৃত কিছু মসলা ব্যবহার করে থাকি। পেঁয়াজুর সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় এখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় লাখ টাকার বেচাকেনা হয়। একটা সময় অনেক কষ্ট করেছি কিন্তু হাল ছাড়িনি। এই ব্যবসা করে বোনদের বিয়ে দিয়েছি, হোটেল করেছি, বাড়িতে বিল্ডিং করেছি। ২৫ জন কর্মচারী-কারিগর নিয়মিত কাজ করছেন। এছাড়া দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কিছু নারী কারিগর রয়েছেন। সবমিলিয়ে প্রতি মাসে তাদের ছয় লাখ টাকা বেতন দিই।’