একসময় সুমাইয়ার পাশে ছিল শুধু মা, এখন সবাই আছে

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী সুমাইয়া তাবাসসুম। এসএসসিতে তাঁদের গ্রামের স্কুল থেকে হাতে গোনা কজন মাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন, সুমাইয়া তাঁদের মধ্যে একজন। টাঙ্গাইলের করোটিয়ায় তাঁর বাড়ি। তাঁরা চার ভাইবোন। বাবার ছোট ব্যবসা। টানাটানির সংসার। সুমাইয়াকে তাই কাছের কলেজেই পড়াতে চাইছিল তাঁর পরিবার। একরকম জিদ করেই শহরের কলেজে ভর্তি হন তিনি।

সুমাইয়া বলেন, ‘যদিও নিজেকে আমি মধ্যম শ্রেণির শিক্ষার্থীই মনে করি; কিন্তু আমার আশপাশের সবাই বলতেন, আমি অনেক ভালো ছাত্রী। জীবনে কিছু একটা করতে পারব। আমার কোচিংয়ের শিক্ষকেরা বলতেন, পড়াশোনা কখনো তোমাকে ছেড়ে যাবে না। তাঁদের কথা শুনতে শুনতে আমি নিজেও একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে আমাকে জীবনে কিছু একটা করতে হবে। তবে একটা কথা বলতেই হয়, মা যদি সব সময় আমাকে প্রেরণা না দিতেন, তাহলে আমি আজকে এ পর্যায়ে আসতে পারতাম না। জীবনের বিভিন্ন সময় যে-ই পাশে থাকুক আর না থাকুক, মা পাশে ছিলেন সব সময়। সবকিছুর ওপরে আমার মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি।’

কিন্তু কলেজে ফলাফল ভালো হলো না। এইচএসসি পরীক্ষায় আর জিপিএ-৫ পেলেন না। সবাই আশাহত হলেও সুমাইয়ার মা কিন্তু হাল ছাড়েননি। মেডিকেলে ভর্তির জন্য কোচিংয়ে ভর্তি করান। কিন্তু সেখানেও ধাক্কা। সেই বছর সুযোগ পেলেন না সুমাইয়া।অন্য কোথাও ভর্তিও হননি। এক পরিচিত তখন বলেছিলেন, ‘এই যে কোথাও তুমি ভর্তি হলে না, এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও না, এই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য সারা জীবন কাঁদবে।’ খুব মন খারাপ হলেও সব সামলে আবার দ্বিতীয়বারের মতো ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। সেবারও ব্যর্থই হলেন। মনের বিরুদ্ধেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। তাঁর নিজেরও তখন বিশ্বাস হওয়া শুরু হলো, তাঁকে দিয়ে আর কিছু হবে না। সেই সময়েই সুমাইয়ার জীবনে ত্রাতা হয়ে আসেন এক বান্ধবী। তাঁর কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের কথা। কিছু না ভেবেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন সুমাইয়া। ফরম তুলে নিজে নিজেই পূরণ করে আবেদন করেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হন। কিন্তু চার বছরের পড়ার খরচ এক হাজার ডলার জেনে আশার শেষ আলোটাও নিভে যায়। তখনই আরেকটা চিঠি পান সুমাইয়া: চার বছর অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ২০১২ সাল থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ও প্রথম আলো ‘ফার্স্ট ফিমেল ইন দ্য ফ্যামিলি স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ নামে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান শুরু করে। অসচ্ছল পরিবারের প্রথম নারী, যিনি উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ গঠনে আগ্রহী, এ রকম ১০ জনকে প্রতিবছর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া শুরু করে প্রথম আলো ট্রাস্ট। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ বৃত্তি কার্যক্রমে সহযোগিতা করে ট্রান্সকম। ২০১৭ সাল থেকে এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড। শিক্ষাবৃত্তিটির নাম এখন ‘অদ্বিতীয়া’। সুমাইয়া তাবাসসুম ২০১৭ সালের অদ্বিতীয়া পাওয়া শিক্ষার্থী। পরিবারের তৃতীয় সন্তান হলেও তিনিই প্রথম নারী সদস্য, যিনি কিনা উচ্চশিক্ষা নিতে যাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব কঠিন ছিল। বাবা পাশে ছিলেন না। ভর্তির প্রয়োজনীয় টাকা দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি। কেবল মায়ের উৎসাহের জোরেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেন সুমাইয়া। চট্টগ্রামের পথে রওনা দেন টাঙ্গাইলের মেয়ে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শেষ করার তিন মাসের মধ্যেই ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং, বাংলাদেশে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে কক্সবাজারে রাইটস অব উইমেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটিতে জেন্ডার অফিসার হিসেবে কাজ করছেন সুমাইয়া।

সুমাইয়া বলেন, ‘জীবনের চরম খারাপ সময়ে আল্লাহ কিছু মানুষ আমার জীবনে পাঠিয়েছিলেন; ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় টাকা দিয়ে, মনোবল ভেঙে যাওয়ার দিনে সাহস দিয়ে পাশে থেকে যাঁরা আমাকে আজকের এই সুমাইয়া হয়ে ওঠার সাহস, শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছেন। জীবনে কোনো দিন তাঁদের ঋণ শোধ করতে পারব না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় যে বাবা আমার পাশে ছিলেন না, সেই বাবা এখন আমায় বলেন, তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করো, আমরা তোমার পাশে আছি। এখন মনে হয়, এইটাই আমার জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি। উচ্চশিক্ষা নিতে আমি দেশের বাইরে যেতে চাই। মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। তবে তাড়াহুড়া করতে চাই না। একটু সময় নিয়ে, নিজেকে গুছিয়ে, ঝুড়িতে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করতে চাই।’