ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রসারে ভূমিকা রেখেছে মানুষের বিশ্বাস

মোহাম্মদ কবির হাসান বাংলাদেশি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিয়েন্সের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিকস ও ফাইন্যান্সের প্রফেসর অব ফাইন্যান্স হিসেবে কর্মরত। অধ্যাপক হাসান ইসলামি ব্যাংকিং সেবাবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর দ্য ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন’–এর নীতি ও শাসনব্যবস্থা কমিটির বোর্ড সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ই–মেইল ও টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান।

মোহাম্মদ কবির হাসান: ধরুন, একটি দম্পতি একত্রে বসবাস করছেন, আরেক দম্পতি বিয়ে না করে। দৃশ্যমান ফলাফল অভিন্ন, কিন্তু তফাত হলো বৈধতার। ইসলাম বলছে, রিবা হারাম। আর সেই পদ্ধতিগত বিষয়টি ইসলামি ব্যাংকিং ঠিক রেখেছে। প্রথাগত ব্যাংকে গিয়ে বলবেন, গাড়ি কিনব। তারা বলবে, টাকা নিন। গাড়ি আমাদের কাছে বন্ধক থাকবে। ইসলামি ব্যাংকে যান, আপনাকে বলবে, আমরা টাকা দিতে পারব না। তবে গাড়িটা আমরা কিনব। আর গাড়ি যদি এখনই চান, তাহলে ব্যাংক ১০০ টাকায় কিনবে। আপনার কাছ থেকে ১১০ টাকা নেবে। ১০ টাকা তার লাভ। আর এক বছর পরে নিলে আপনার সঙ্গে তার একটা চুক্তি হবে। তখন তাকে আরও ২০ শতাংশ লাভ দিতে হবে। এই চুক্তির সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকের ২০ শতাংশ সুদ নেওয়ার ঋণচুক্তির তফাত নেই। মৌলিক তফাতটা হলো ইসলামি ব্যাংক আপনাকে টাকা দিচ্ছে না, গাড়ি দিচ্ছে। আবার ঋণ শোধ দিতে না পারলে ইসলামি ব্যাংক আপনার ওপর অতিরিক্ত চার্জ করবে না। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংক আপনার ওপর অতিরিক্ত চার্জ করবে।

কবির হাসান: এ জন্য লোকে ভাবে, কথা তো একই। আসলে কথা এক নয়। তাই আমি দুটির পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে বলি, ইসলামি ব্যাংকিংয়ে আদলটা হলো শরিয়াহর। ফল বা সারবস্তু অনেকটা প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে মিলে যায়। শরিয়াহ মেনে চলায় ইসলামি ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার মূল জায়গায় আলাদা হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ অনেক সময় একই ধরনের ব্যাংকিং দেখে যে অভিযোগ করেন, সেটাও অসার নয়। অর্থায়নের ক্ষেত্রে গরিব লোক হলে উভয়েই আগে জেনে নেবে তার সম্পদ আছে কি না। তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ইসলামি ব্যাংকিং কল্যাণমুখী হলো কী করে। খালি চোখে তো আমি কোনো পার্থক্যই দেখতে পাচ্ছি না। আবার এটাও সত্য যে ইসলামি ব্যাংকগুলো শরিয়াহ লঙ্ঘন করছে না। এ বিষয়ে আমার অবস্থান হলো ইসলামি ব্যাংকিং দিয়ে ইসলামি অর্থায়ন হবে না। ব্যাংকিং আর ইসলামিক অর্থায়ন দুই বিষয়। ইসলামিক অর্থায়ন অনেক বড় বিষয়। ইসলামি ব্যাংকিং তার অংশমাত্র। ইসলামি ব্যাংকগুলো অনেকটা প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছে। এর উপাদানগুলোও অনেকটা একই। তাই বিভ্রান্তি দেখা দেয়।

কবির হাসান: একেক দেশে ইসলামি ব্যাংকিং একেকভাবে বেড়ে উঠেছে। মালয়েশিয়ায় এটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়েছে। তারা তখনই আইন করেছে। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং শুরু করলেও আজও আইন করেনি। মালয়েশিয়ার ব্যাংকিং খাতের মোট ৩০ শতাংশ, আর বাংলাদেশে ২৫ শতাংশ ইসলামি ব্যাংকিং। শরিয়াহর কথা হলো, তোমরা ব্যবসা করো, কিন্তু সুদে অর্থ লেনদেন কোরো না। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে ইসলামি ব্যাংকিংয়ে নিজেদের যুক্ত রেখেছেন। বহু মানুষ শরিয়াহর ভিত্তিতে অর্থনৈতিক জীবন চালাতে চান। সে কারণেই এখানে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রসার ঘটছে। মানুষের বিশ্বাস, এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ গ্রাহকই মুসলিম। মালয়েশিয়ায় উল্টো, ৭৫ শতাংশ গ্রাহকই অমুসলিম। কারণ তাঁরা দেখেছেন এখানে স্বচ্ছতা আছে, কোনো অনিয়ম নেই।

কবির হাসান: তুলনামূলক সমীক্ষা নেই। তাদের মধ্যে শরিয়াহ নিয়ে প্রশ্ন নেই, তবে প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আছে। যেখানে আইনের মধ্য দিয়ে ইসলামি ব্যাংকিং হয়েছে, সেখানে প্রায়োগিক জটিলতা কম। তবে যে কথাটা আমি বারবার বলতে চাই, যে মডেল নিয়ে প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকিং চলছে, তার মাধ্যমে ইসলামিক অর্থায়ন করা যাবে না। সুতরাং ইসলাম যে কল্যাণমুখী ব্যবস্থার কথা বলছে এবং যেটা ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূলকথা, বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকিং যেভাবে চলছে, তাতে সে উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না।

কবির হাসান: পাকিস্তানে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের শুরু ১৯৭৫ সালে। তাদের অবস্থা এখন ভালো। কারণ তারা আইন করেছে। আমাদের দেশের তুলনায় পাকিস্তানের ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার অসংগতি অপেক্ষাকৃত কম। আমাদের চেয়ে ওদের শৃঙ্খলা কিছুটা বেশি। তবে বিশ্বের প্রথম ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সূচনা দুবাইতে। সেটাও ১৯৭৫ সালেই।

কবির হাসান: মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থেকেছে। এর মধ্যে তারা ধর্মবিশ্বাসকে ধরে রাখতেই বেশি মনোযোগী থেকেছে। বাণিজ্যে মনোযোগ দিতে পারেনি। বিদেশি শাসকেরা সর্বদা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পদানত রাখতে চেয়েছে। তারা নিজেরা ইসলামি অর্থায়ন নিয়ে প্রচুর অধ্যয়ন করেছে। কিন্তু মুসলমানদের জাকাত বা ওয়াক্‌ফ—এসব করতে দেয়নি। ১৯৬০–এর দশকে উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বহু মুসলিম রাষ্ট্র ভেবেছে, তারা ইসলামসম্মত ব্যবস্থা চালু করবে। সেই চিন্তাধারার প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের শুরু।

কবির হাসান: বাংলাদেশে একটা ভুল ধারণা আছে যে জামায়াতে ইসলামী এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তক ও সমর্থক। এটা ঠিক, বৃহত্তম এই ব্যাংকটির শুরুতে জামায়াতের সমর্থকেরাই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু জামায়াতের জনসমর্থন তো ৫ শতাংশ। তাহলে ৩০ শতাংশ মানুষ ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো কী করে? বহু মানুষ ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলতে ভালোবাসে। তাই তাদের মধ্যে শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিংয়ের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে।

কবির হাসান: জ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো ইসলামি ব্যাংকিং নিয়েও তাঁরা গবেষণা করেছেন এবং এখনো করছেন। আমি নিজে বেশ কিছু অমুসলিম গবেষকদের সঙ্গে ইসলামি অর্থায়ন নিয়ে কাজ করেছি। তাঁদের মধ্যে আছেন অস্ট্রেলিয়ান অধ্যাপক মারভিন লুইস, খ্রিষ্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন সংশয়বাদী। ইসলামি অর্থায়নের প্রায়োগিক দিক নিয়ে যাঁরা বেশি কাজ করেছেন, তাঁদের অন্যতম ভারতীয় আমেরিকান নাগরিক ভি এস সুন্দরা রাজন। আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ, হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি করেছেন। ইসলামি অর্থায়নের মান নির্ধারণ ও নীতিগত কাঠামোর স্বার্থে ইসলামি ফিন্যান্স সার্ভিস বোর্ড গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর গভর্নরদের তিনি ইসলামি ব্যাংক ও মূলধনি বাজারকে কীভাবে কাঠামোগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রয়োগ করা যায়, সে ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছেন। এ কাজ করতে গিয়েই সুদানের রাজধানী খার্তুমে তিনি মারা যান।

কবির হাসান: তাঁর কাছে আমিও এটা জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, দেখুন, আমি বহু বছর আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেছি। নানা সংকট দেখেছি। এসবের সুরাহা খুঁজে পাওয়ার চিন্তা থেকে আমি ইসলামি অর্থায়নের বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কেন অস্থিরতা ও অসাম্য, তার কারণ বোঝার চেষ্টা করেছি। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনেক স্থিতিশীলতা এবং গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে ইসলামি অর্থব্যবস্থা। সমাজে অসাম্য দূর করতে এটা খুব জরুরি।

কবির হাসান: পাশ্চাত্যের কোনো গবেষকদের কারও লেখায় আমি এর স্বীকৃতি পাইনি। সম্পদের সুষম বণ্টন, সুদমুক্ত কিন্তু শ্রমঘন শিল্প—এই সবই ইসলামের মোদ্দা কথা। কমিউনিজমের চাওয়াটাও এর কাছাকাছি।কবির হাসান: চীন কিন্তু ইসলামি অর্থায়ন শুরু করেছে, বিশেষ করে তাদের মুসলিম বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে। রাশিয়া এ রকম ভাবছে। রাশিয়ায় কয়েকটি শাখা খোলা হয়েছিল, কিন্তু সফল হয়নি। তবে তাদের আগ্রহ কমেনি।কবির হাসান: আমি জোর দিয়ে বলব, প্রচলিত বা ইসলামি ব্যাংকিং মানুষের জন্য সেভাবে কল্যাণ বয়ে আনছে না।

ইসলামি ব্যাংকগুলো অনৈসলামিক কিছু করছে না, তার মানে এই নয় যে তারা যা করছে, সেটা জনকল্যাণমুখী। তারা করপোরেট গ্রাহকের দিকে তাকিয়ে থাকে। আপনি একটা শিক্ষাগত ডিগ্রি নিতে ঋণ চাইলে তারা এক পয়সা ঋণ দেবে না। তারা বৃত্তির মতো কিছু কর্মসূচি রেখেছে, অনেকটা লোক দেখানোর মতো করে। শেষ পর্যন্ত তারাও অনেকটা মুনাফাভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। জাকাত সরকারিভাবে সংগ্রহ ও বিতরণ করা দরকার। একই সঙ্গে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মতো যারা আছে, তাদের আরও সুযোগ করে দেওয়া উচিত। বাংলাদেশে ওয়াক্‌ফের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। একজন কোটিপতি মানবসেবার জন্য তাঁর সম্পদ ওয়াক্‌ফ করবেন।

কিন্তু এ জন্য দেশে কাঠামো দরকার। জাকাত ও ওয়াক্‌ফ সরকারের বাজেটারি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। অথচ এ নিয়ে কোনো চিন্তা দেখছি না। পয়সা কামানোর জন্য প্রচলিত ব্যাংকগুলো ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ক্ষমতাসীন দল–সমর্থিত তিনটি ব্যাংক সম্প্রতি নিজেদের ইসলামি ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য দরখাস্ত করেছে। ৩৭ বছর ধরে আমি দেখছি, ইসলামের মূল্যবোধ সেভাবে কিন্তু আমরা অনুসরণ করিনি।কবির হাসান: আগেই বলেছি, ইসলামি ব্যাংকের মাধ্যমে পূর্ণরূপে জনকল্যাণ বা মানুষের উপকার হচ্ছে না। তাই ব্যাংকের বাইরে জাকাত, সুদমুক্ত অর্থায়ন, ওয়াক্‌ফ—এসব নিয়ে কাজ করতে হবে।

ইসলামি ব্যাংকগুলোর চলতি উদ্বৃত্ত অর্থ হয়তো রাজনীতিতে কাজে লাগবে। এর ফলে ব্যবস্থাটি ধ্বংস হচ্ছে। সেটা একটা বেদনাদায়ক দিক। জামায়াত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করেছে। পক্ষান্তরে, আওয়ামী লীগ বা অন্যান্য দলও ধর্মীয় ভিত্তির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। ইসলামি অর্থব্যবস্থার সুফল সবার ঘরে পৌঁছে দেওয়া ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ধর্ম–নির্বিশেষে মানুষের কাছে ইসলামি অর্থায়নের সুবিধা পৌঁছাতে নন–ব্যাংকিং খাত, যেমন জাকাত বা ওয়াক্‌ফ–ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে হবে।