অবশেষে সব সত্য জানালেন শিপ্রা

অবশেষে পুলিশের গুলিতে সেনবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন মেজর সিনহার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথ।একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেয়া ভিডিও বার্তায় শিপ্রা দেবনাথ সিনহা হত্যাকান্ডের দিনে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির বর্ণনা দেন।ভিডিও বার্তার শুরুতেই শিপ্রা বলেন ৩১ জুলাই ওসি প্রদীপ এবং এসআই লিয়াকত ঠান্ডা মাথায় মেজর সিনহাকে হত্যা করেন।

এসময় তিনি কর্মকর্তা, তদন্তকারী সহ যাকেই সামনে পেয়েছেন তার নিকটই মেজর সিনহাকে শেষবারের মতো একবার দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। শিপ্রা বলেন, “যাকেই সামনে পেয়েছি তার নিকটই আকুল আবেদন জানিয়েছি, আমাকে নিয়ে যা খুশি করুন, আমিতো পালিয়ে যাচ্ছি না কিন্তু মেজর সিনহাকে শেষবারের মত একবারের দিন।”এসময় তিনি জানান, সিনহার সাথে তার প্রায় এক বছরের পরিচয় এবং সিনহা অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন।

সিনহা তাদের ডকুমেন্টারি তৈরির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন এবং সিনহাোর মত একজনের সাহচর্য পেয়ে তারা সৌভাগ্যবান।ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে শিপ্রা বলেন, ৩১ জুলাই রাত ১২ টার পর সার্চ ওয়ারেন্ট ও মহিলা পুলিশ ছাড়াই প্রায় ১০-১২ জন পুলিশ তাদের রিসোর্টে প্রবেশ করে কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়েই তল্লাশি শুরু করেন। এসময় তিনি বার বার তার বন্ধু সিফাত এবং মেজর সিনহার কথা জানতে চাইলেও পুলিশ সদস্যরা কোনো উত্তর প্রদান করেননি।

পরবর্তীতে রাত আনুমানিক ২.৩০ এর দিকে সিভিল ড্রেসে কয়েকজন অফিসার আসলে তিনি আবারও তাদের নিকট প্রশ্ন করেন এবং অফিসাররা জানান মেজর সিনহা মারা গেছেন। এরপর রাত আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে শিপ্রা এবং শিপ্রার সহকর্মী তাহসান নূর রিফাত রুফতিকে রামু থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে দুপুরের দিকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেয়া হয়। এসময় শিপ্রা সকলের নিকট বারবার সিনহাকে দেখার অনুরোধ জানালেও কেউ তার অনুরোধ রাখেননি।শিপ্রা জানান, রাত ৮ টা বা ৯ টার দিকে তাকে একা একটি পুলিশ ভ্যানে করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং সেখানেই তিনি জানতে পারেন তিনি মাদক মামলার আসামী।

এসময় শিপ্রা কক্সবাজার জেলের নারীদের দূরাবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, “কক্সবাজার কারাগারে থাকার সুবাদে কক্সবাজার জেলে থাকা সকল মহিলা কয়েদিদের আর্তনাদ ও হাহাকার দেখার সুযোগ হয় আমার। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম টেকনাফ উপজেলার সকল উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত পুরুষ মাদক ব্যবসায়াী কিন্তু তাদেরকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারে দেয়া, তাদের স্ত্রীদের নির্যাতন করা কোন আইনে পড়ে?” এসময় তিনি অভিযোগ করেন মুক্তিপণের টাকা নিয়েও স্বামীকে জীবিত নয় স্বামীর লাশ ফিরিয়ে দেয়া হয় আর কেউ প্রশ্ন করলে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে দেয়া হয়।

শিপ্রা জানান তিনি নির্যাতনের ফলে নারীদের শরীরের পচন এবং বিকলাঙ্গতা দেখে এসেছেন কারাগার থেকে। তিনি এসকল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য হলেও মানবাধিকার কর্মীদের বা আইনের কাউকে সেখানে যাওয়ার এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান।শিপ্রা বলেন, “আমি অতি ক্ষুদ্র মানুষ, আমার ক্ষমতা খুবই অল্প। তবে জেল থেকে বের হওয়ার সময় কয়েদখানার সিংহভাগ অসহায় নারী, কেউ কেউ দুধের শিশু বুকে নিয়ে আমায় ভীষণভাবে অনুনয় করেছিলেন আমি যেনো তাদের কথা বাইরে এসে বলি। তার সেই দায়ভার এখনও আমি কাটাতে পারিনি।

এছাড়া, শিপ্রা দাবি করেন সিনহার মৃত্যুর পর তাকে এবং তার সহকারী সিফাতকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের পর পুলিশ তাদের কটেজ থেকে দুটি মনিটর, একটা ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, ক্যামেরা, লেন্স এবং তিনটি হার্ডডিস্ক নিয়ে যায় যেগুলো জব্দ তালিকায় নেই। আর এসব ডিভাইস থেকে বিভিন্ন ছবি চুরি করে কিছু অফিসারা সেগুলো ভিন্ন অর্থে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন। এসময় তিনি এই কাজে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার কথা জানান এবং প্রধানমন্ত্রী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন বলে আশাব্যক্ত করেন।

এসময় তিনি বলেন সকল পুলিশ কর্মকর্তা এর জন্য দায়ী নয়, এখানে অনেক সৎ পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছে। কিন্তু মানুষ হত্যাকারী এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন মানুষকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনকারীদের বিচারের আওতায় না আনলে তার দায়ভার পুরো বাহিনীর ওপর পড়বে।শিপ্রা সিনহা হত্যার বিচার চেয়ে, তার তার সহকর্মীর চরিত্র হননের বিচার চেয়ে, দেশের সকল মানুষের নিরাপত্তা চেয়ে বলেন, “একজন মানুষ হত্যাকে ধামাচাপার জন্য আমার টুটি চেপে ধরে তাকে আত্মহননেন দিকে ঠেলে দিলে লাখো তরুণ তরুণী এর প্রতিশোধ নেয়া থেকে নিশ্চয়ই বিরত থাকবেনা।”সবশেষে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, জাতির পতাকা আবারো সেই পুরানো শকিন খামচে ধরেচে এবং একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ই পারবেন এই দেশকে বাঁচাতে।ভিডিওঃ ডিবিসি নিউজ